Description

ছোটবেলা থেকেই সবসময় অনেক ভালো একাডেমিক রেজাল্ট থাকার কারনে পরিবারের সবার অনেক আশা ছিলো আমাকে নিয়ে ৷ সবাই ভাবতো অনেক ভালো কিছু করবো ৷ আমার নিজেরও ছিলো আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন ৷
সবকিছু ঠিক ভাবেই চলছিলো ৷ এরমধ্যে আমার ছোট ছেলে তাহীম জন্মালো ৷ একটা প্রিম্যাচুয়ুর দেড় কেজি ওজনের বাচ্চা জন্ম দেয়া , প্রতিটা মুহূর্তে বাচ্চাটাকে জীবনের জন্য লড়াই করতে দেখা এবং তা শক্ত হয়ে মোকাবেলা করা একটা মায়ের জন্য কতটা কঠিন হতে পারে এটা আসলে বলে বুঝানোর মতো না ৷ আমি কখনো কাঁদতাম না ৷ শুধু ভিতরটা কেমন ভারী হয়ে থাকতো ৷ কেউ বোঝেনি , কেউ বুঝবে সেই আশাও করিনা ৷ এভাবে কস্ট চাপা রাখার ফল পেলাম , পাবারই ছিলো আগে বা পরে ৷
হঠাৎ করে খেয়াল করলাম আমি কিছু মনে রাখতে পারিনা ৷ কিছু না মানে কিছুই না ৷ সময় সময় ভুলে যেতাম যে আমার দুটা বাচ্চা আছে , যাদের মধ্যে একজন এখনো খুবি ছোট ৷ তাহীমের তখন দেড় কি দুই মাস বয়স ৷ একদিন ঘরে ঢুকে মনে হলো আচ্ছা এই ঘরে ফ্যান চলতেছে কেন ? আমি ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে কাজে চলে গেলাম ৷ আসলে ওই ঘরে আমার ছোট ছেলে ঘুমাচ্ছিলো ৷ গরমে বাবু উঠে গিয়ে কান্না শুরু করে , আর তখন আমি ভাবতেছি কার বাচ্চা এতক্ষন ধরে কাঁদতেছে , ওর মা কি কানে শোনেনা….তখন আমার বড় ছেলে এসে বলে মামনি তাহীম কাঁদতেছে…আমি লিটারেলি ওকে জিজ্ঞেস করছিলাম “কে তাহীম ?”  মানে অবস্থাটা এমন ভয়াবহ ছিলো ৷ রাতের পর রাত আমি ঘুমাই না ৷ সারাক্ষন মনে হয় আমার বাচ্চাটা বেঁচে আছে তো এখনো ! আমি রাত জেগে ওকে বুকে নিয়ে বসে থাকতাম ৷ ওর নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখতাম নিঃশ্বাস নিচ্ছে তো …. আমি যেন পাগল হয়ে গেছিলাম সে সময় ৷
তারপরও পড়তাম ৷ অনেক পড়তাম ৷ ভাবতাম বারবার পড়লেই পারবো ৷ কিন্তু পরের বার পড়তে বসে দেখতাম সব ভুলে গেছি ৷ একদম নতুন সব পড়া মনে হতো ৷ পড়াশুনা বন্ধ করে দিলাম , আমি আসলে লোড নিতে পারছিলাম না ৷
কিন্তু তখন অবস্থা এমন হলো আমার যদি বিষ খাবারও দরকার হয় আমাকে আমার স্বামীকে বলতে হয় টাকা দাও ৷ চাইলেই সে দিতো , কিন্তু আমি সবসময় নিজের মতো চলা মানুষ ৷ সবসময় টিউশনি করাইছি ৷ বড় ছেলেকে সাথে নিয়েও টিউশনি করাতাম ৷ হঠাৎ করে নিজের সামান্য থেকে সামান্য চাহিদার জন্য স্বামীর কাছে হাত পাতা এই ব্যাপার আমার পক্ষে মানা খুব কঠিন ছিলো ৷
সারাদিন বসে বসে ভাবলাম ৷ কি করা যায় ৷ না পড়া আর হবে না ৷ কিন্তু বেকার জীবনটা আর কতদিন বয়ে বেড়াবো ৷ সারাদিন ভাবলাম কি করবো ৷
সারাদিন পর মনে হলো আমি আমার শখটাকেই পেশা বানাতে পারি… কিন্তু তার জন্য তো টাকা দরকার , অল্প হলেও দরকার ৷ ডিটারমাইন্ড ছিলাম কারো কাছে চাইবো না ৷ যা হবে তা নিজের হবে ৷ একটু একটু করে জমাতে শুরু করে ফেললাম ৷ বিজনেস শুরু করলাম পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ৷ প্রথম মাসেই দুটা বড় বড় ধাক্কা খাইলাম ৷ গাঢ় নীল রঙের বলপ্রিন্ট অরবিন্দু স্পেশাল ভয়েল কিনছিলাম বেবী ড্রেস বানাবার জন্য ৷ জামাটা সবার ভীষণ পছন্দ হয় ৷ ঐ একটা জামার অর্ডার পেলাম দশ বারোটা ৷ কিন্তু কথায় আছেনা সময় খারাপ হলে সাদা কাপড় থেকেও রং উঠে , আর এটা তো গাঢ় নীল ৷ ১৩০ টাকা গজের সেই কাপড় থেকে রং উঠলো ৷ একজন কমপ্লেইন করাতে সবাইকে নিজ থেকে বলে টাকা ফেরত দেই , আর যাদের ডেলিভারী তখনও দেইনি তাদেরকে বলে অর্ডার ক্যান্সেল করি ৷ বিশাল একটা লস হলো ৷ তারপর এক অসাধারণ মহিলা আমার প্রায় দুই হাজার টাকার বেবী ড্রেস নিয়ে টাকা দিলোনা ৷ পরপর দুটা লসে আমি আরোও ডিপ্রেশনে পরে গেলাম ৷ তার মধ্যেই আমার ব্যাকপেইনে আমি মোটামুটি বিছানায় পরে গেলাম ৷ ভেবেছিলাম বিজনেস বোধহয় বন্ধ হয়ে গেলো ৷
কিন্তু আমি আসলে থেমে যাওয়ার মানুষ না ৷ আমি যতবার ভাঙবো ততবার নিজেকে গড়বো ৷ এক মাস ব্যবধানে আবার শুরু করলাম নতুন করে ৷ ব্যাক পেইনের জন্য মেশিনে সেলাই করা বন্ধ করলাম ৷ শুরু করলাম ক্রাফটিং ৷ এর পর আস্তে আস্তে আরো নানান কিছু এড করি ৷ আল্লাহর রহম একাবছর পার হয়েছে…থামিনি কখনো , থামবোও না …
যারা নিজে কিছু করতে চান , তাদের বলবো উদ্দোক্তা হতে কিচ্ছু লাগেনা শুধু লাগে ধৈর্য্য আত্মবিশ্বাস…
সবার জন্য শুভকামনা
owner of আনন্দী

Photos