Description

কিছুটা কনজারভেটিভ ফ্যামিলির মেয়ে আমি। ছোট থেকেই কড়া শাসনে বড় হয়েছি। নীলফামারীর
মেয়ে হলেও বাবার সরকারী চাকুরীর সুবাদে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা গাজীপুর এ।
গাজীপুর থেকেই ২০০৭ তে এসএসসি ও ২০০৯ তে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাশ করি।
ডিজাইনিং নিয়ে পড়ার স্বপ্ন থাকলেও ফ্যামিলির অনিচ্ছার কারণে তা স্বপ্নই রয়ে গেছে।
অবশেষে পরিবারের ইচ্ছায় পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অনুষদ এ
গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করি ২০১৪ তে এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ করি
২০১৬ তে।
সব গার্ডিয়ানের মতো আমার বাবা-মারও ইচ্ছে আমি সরকারি চাকুরী করবো।
আমার পড়ালেখা শেষ হবার কিছুদিন পরই হঠাৎ করে মা‌ অনেক অসুস্থ হয়ে যায়। ২০১৭ এর
জানুয়ারীতে ঢাকা তে শিফট করার কথা ছিলো, জবের প্রিপারেশন এর জন্য। সেই মাসেই মা’র
অপারেশন হয়। জরায়ু টিউমারের অপারেশনের পর কিছুটা সুস্থ হওয়া মাত্রই দেখা দেয় কিডনীর
সমস্যা। সর্বক্ষন মা এর সাথে থাকতাম।
তারপর ২০১৭ এর আগস্ট এ মা-বাবার সাথে শিফট হলাম নীলফামারীতে। যেই আমি আজন্ম
শহরে বেড়ে উঠেছি, সেই আমি হঠাৎ করে গ্রামে যেয়ে ঠিক এডজাস্ট করতে পারছিলাম না। প্রচন্ড
অস্থিরতায় একেকটা দিন কাটতো‌। সহপাঠিরা একেকজন যেখানে ক্যারিয়ার শুরু করে দিয়েছে,
সেখানে আমি তখনও ঠিকমতো প্রিপারেশনই নিতে পারিনি গভঃ জবের জন্য। ভালো মতো
প্রিপারেশন না থাকা এবং নীলফামারী থেকে ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেয়া ছিলো খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার,
এইসব কারণে দেখা যেতো আমার ম্যাক্সিমাম পরীক্ষাই মিস হয়ে যেতো। খুব ডিপ্রেসনে পরে যাই
সব কিছু মিলিয়ে।
মা কিছুটা সুস্থ হলে বাবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই ২০১৮ এর জুলাই তে চলে আসি গাজীপুর,
বড় আপুর কাছে।
সরকারী জবের জন্য খুব ভালো প্রিপারেশন কোনভাবেই নিতে পারছিলাম না, ওই যে ফ্রাস্টেশন পিছু
ছাড়ছিলো না। প্রাইভেট জব এর ট্রাই করতে চাই। এই ক্ষেত্রেও বাবার নিষেধের মুখে পড়ি। অস্থির
লাগতো খুব। সারাদিন শুধু মনে হতো, "আমার কিছু করতে হবে"।
শুরুর পথটা মসৃন ছিলো না। যেহেতু আমার তেমন কোন মূলধন ছিলো না, আর সেই সাথে ছিলো
না ফ্যামিলির কোন সাপোর্ট। শুধু ছিলো নিজের প্রতি নিজের আত্মবিশ্বাস আর ছিলো স্রোতের
বিপরীতে চলে নতুন কিছু করার দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি। কোন কিছু না ভেবেই একদিন ফেসবুকে ওপেন
করলাম একটি পেজ। যার নাম "সপ্তরং"। সপ্তরং মানে জীবনের সব রং।
মা আর বড় তিন বোনকে দেখে দেখে শিখেছিলাম টেইলারিং এর কাজ। আর ছোট থেকেই ড্রয়িং এ
ভালো ছিলাম। যেখানে যা দেখতাম, হুবহু কপি করে ফেলতে পারতাম। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
নেই আমার এসবের উপর। ড্রয়িং এর দক্ষতা, টেইলারিং এর ধারণা আর নিজের উপর পূর্ণ
আত্মবিশ্বাস, এই তিন জিনিস কে সঙ্গী করে ২০১৮ এর ১লা অক্টোবর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়
আমার স্বপ্নের “সপ্তরং” এর।
পেজ তো ওপেন হলো, কিন্তু প্রোডাক্ট পাবো কোথায়? প্রি-অর্ডারের ভিত্তিতে কাজ করার জন্যও
তো কিছু সেম্পল দরকার। তারপর মনে হলো বড় তিন আপুর বাবুদের জন্য প্রায়ই বিভিন্ন
ডিজাইনের ড্রেস বানাতাম। তারই কিছু ছবি পেজ এ দেবার সিদ্ধান্ত নেই। এপ্লিকের কাজ করা
একটি ফ্রক ছিলো পেজ এর প্রথম প্রোডাক্ট। পোস্ট করার ঘন্টা খানেক পরেই প্রথম অর্ডারটি পেয়ে
যাই আমি। প্রথম অর্ডারটি ছিলো একটি কাস্টমাইজড অর্ডার। ফ্রকের ডিজাইনটি করতে হবে
থ্রিপিসে। এরপর প্রথম মাসেই আরো তিনটি অর্ডার অর্থাৎ মোট চারটি অর্ডার পাই। যা আমার
ধারণার থেকেও অনেক বেশি কিছু ছিলো.. টিউশনীর ১০০০/- টাকা দিয়ে প্রোডাক্ট রেডি করতে
শুরু করি। পেজ এর আড়াই মাস বয়সে পাই বড় একটি অর্ডার। আলহামদুলিল্লাহ, আমার ক্লায়েন্ট
রা পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলো। আমার কাজের প্রতি স্পৃহা ও ভালবাসা দেখে আপু-দুলাভাইরা এগিয়ে
আসে। বিভিন্ন ভাবে তারা সাহায্য করে আমায়। কিন্তু তখনো আব্বু কিছু জানতো না।
একা একা কোথাও যাবার পারমিশন আমার ছিলো না। আবার গাজীপুরে সব কাচামাল পাওয়া না
যাওয়ায় আমি প্রায়ই ঢাকা যাবার প্রয়োজন বোধ করি। যেহেতু আব্বু বিজনেসের কথা শুনলে ক্ষেপে
যাবে আর কোন দরকার ছাড়া ঢাকা যেতে দিবে না, তাই আমি একটি উপায় বের করি। আমি
আবার বিভিন্ন চাকুরীর পরীক্ষা দেয়া শুরু করি। এতে করে আমার ঢাকা আসার প্রবলেম মোটামুটি
সলভ হয়।
এভাবে প্রতি পদে পদেই নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হই। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ঠিকই অলটারনেটিভ
কোন উপায় বের করি।
"সপ্তরং" এর নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখানের প্রায় ৯৫% প্রোডাক্টই আমার নিজ হাতে তৈরি।
সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিজাইন এবং নিঁখুত হাতের কাজে আমি ফুটিয়ে তুলি প্রতিটি ড্রেস। আমি মূলত
রিবন, এপ্লিক, হ্যান্ড-পেইন্ট ও সুতার কাজ করে থাকি। চেষ্ঠা করি গতানুগতিক ধারার বাহিরে
নতুন কিছু নিয়ে কাজ করতে।
একদম শুরু থেকেই দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করে সপ্তরং।
কাপল, ফ্যামিলি, সিঙ্গেল ড্রেস, ব্লাউজ পিস, পান্জাবী, টি-শার্ট, বেবি ড্রেসের পাশাপাশি হ্যান্ড
মেইড গহনাও রয়েছে এতে।
একদম ন্যূনতম মূলধনে সপ্তরং শুরু হলেও আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাকে কখনো নিরাশ হতে
হয়নি বা পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। মাঝে দু’মাস একদমই কোন অর্ডার ছিলো না, তবে আমি
হতাশ হইনি, আল্লাহর উপর ভরসা ছিলো।
কাঁচামাল সোর্সিং থেকে শুরু করে ড্রেস ডিজাইনিং, রেডি করা, প্যাকিং, ডেলিভারী দেয়া, সব নিজ
হাতে করি।
শুরু থেকেই নিজস্ব প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করছি, তাই আমার প্রোডাক্ট গুলো মার্কেটের আর সব
প্রোডাক্ট থেকে আলাদা।
আমার ফ্যামিলি যেখানে প্রাইভেট সেক্টরের জব ই প্রিফার করে না, সেখান থেকে বিজনেসে আসা
অনেক বেশি চ্যালেন্জিং ছিলো আমার জন্য। প্রথম এক বছর আমি বাবাকে না জানিয়ে বিজনেস
করেছি। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি কাজ করতে বসতাম। কত নির্ঘুম রাত কেটেছে আমার!
অনেক বাঁধা এসেছে। কাছের-দূরের মানুষদের অনেক কথা হজম করেছি এবং এখনে করছি।
তারপরও লেগে আছি বিজনেসের সাথে। কারো কোন কথা আমাকে এক পা পিছু হটাতে পারে নি।
আমার বিশ্বাস, আমার যোগ্যতা ও আমার কাজ দিয়েই আমি একদিন সবার ভালবাসা অর্জন
করবো।
কোন কাজই আসলে সহজ নয়। ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে হয়। আর কোন কিছুর পেছন লেগে
থাকলে ইনশাল্লাহ তা সফল হবেই।
সাধারণের মাঝেই, অসাধারণ কিছু- এই স্লোগান নিয়েই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, আমার সপ্তরং –
SoptoRong

Photos